পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প সংলগ্ন মৌজায় লুন্ঠিত কৃষি জমি/সিন্ডিকেট কবলে মালিক

0
153

মাহবুব আলম প্রিয়, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) থেকে ঃ কৃষকের কষ্টার্জিত ফলানো ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়াতে সিন্ডিকেট কবলের হাত থাকে। সেসব সিন্ডিকেটে ধান, সব্জি, গৃহপালিত পশুর কথাই জানি। কিন্তু সেই কৃষকের কৃষি জমি কিংবা তাদের বসত ঘর প্রয়োজনে বিক্রি করতে গেলেও একই কায়দায় সিন্ডিকেট কবলে পড়ে ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি জালিয়াতি, জোর জুলুম ও অত্যাচার করে লুন্ঠন করে নিচ্ছে বাপ দাদার রেখে যাওয়া কিংবা বৈধভাবে ক্রয় করা জমি। এমন চিত্র দেশের নানাপ্রান্তে থাকলেও ভয়াবহ আকার ধারন কওে আছে বহুদিন ধরে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকার আশপাশের মৌজায়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ইং সনে পরিকল্পিত শহর বাস্তবায়ন করার জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প নামে জমি অধিগ্রহণ শুরু করে । সে সময় উপজেলার ব্রাহ্মণখালী, পশ্বি ,পিতলগঞ্জ, গুতিয়াবো, বাগবের, হিড়নাল, লক্ষ্যা শিমুলিয়া, রঘুরামপুর, ভোলানাথপুর, বাড়িয়া ছনিমৌজাসহ বেশ কিছু মৌজায় এ কাজ শুরু হয়। পরে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের পারাবর্তা ও বরকাও মৌজাকে যুক্ত করা হয়। স্থানীয়রা জানায়, বাপ দাদার ভিটে রক্ষায় সে সময়ও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাঁধা প্রদান কওে অধিবাসিরা। এলাকা রক্ষায় একটি পক্ষ প্রতিরোধ কমিটিও গঠন করে। সেই প্রতিরোধের ঘটনায় প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের গুলিতে সিরাজদ্দিন নামে এক ব্যক্তি নিহতও হন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধূরী স্থানীয়দের বুঝিয়ে সে প্রতিরোধ থামিয়ে দেন। সেই বুঝিয়ে দেয়ার শর্ত ছিলো স্থানীয় অধিবাসিদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা। এর মাঝে ছিলো প্রতিজন জমি মালিক নির্ধারিত হারে প্লট পাবেন, ক্ষতিগ্রস্থরা প্লট ও ফ্ল্যাট পাবেন। গাছ পালা ও ঘরবাড়ির ক্ষতিপূরণ পাবেন। এমন নানা সুবিধায় রাজি হন তারা। অনেকে বিল তুলেন বটে। পরে সেই বিলের টাকায় পাশের মৌজায় জমি কিনে রাখেন। কিন্তু একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও জালিয়াতের কবলে পড়ে বহু স্থানীয় জমি মালিক তাদের সর্বস্ব হারায়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ এল এ শাখায় বিল তুলতে গেলে সুইট ও ডেবিট নামীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হতো। তৎকালীন সার্ভেয়ার চুন্নু, সহকারী আদিলদের খুশি করতে না পারলে কেউ উপযুক্ত বিল তুলতে পারতো না। আবার জমিতে আইনি ঝামেলা বা কোন রকম অমিল মেলে কাননগো সার্ভেয়ার ও সংশ্লিষ্টদের অর্ধেক, তিনভাগা শর্তযুক্ত ভাগ দিতে হতো। এসব টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরার পথে অনেকেই ছিনতাই কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এভাবে রক্তচোষাদের কবলে পড়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে অনেকেই ভিক্ষে করে কিংবা কোনমতে বেঁচে আছেন । আবার অসাদু কর্মকর্তাদের খুশি করে পূর্বাচলের অনেক অধিবাসিরাই নিজের নাল জমিকে বাড়ি দেখিয়ে, ছনের চালার ঘরকে ৫ তলা বাড়ি দেখিয়ে, বিলের তলায় আনারস বাগান দেখিয়ে, মুরগীর খোয়ারকে বাণিজ্যিক খামার দেখিয়ে নানাভাবে প্রতারণা করে কোটি পতি হয়েছেন। এতে সরকারী অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটলেও প্রতিকারের খবর নেই। এভাবে কোটি পতি হওয়ার সংখ্যা পূর্বাচলে বহু। অভিযোগ রয়েছে, রাজউক ও এল এ শাখার অসাদু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সহায়তায় প্রকাশ্যেই এমন অনিয়ম হলেও দৃশ্যমান কোন তদন্ত ও বিচারের কথা জানা নেই কারো। এসব সিন্ডিকেটের কবলে ঘটেছিলো। বাধ্য হয়ে সব কিছু মেনে নিয়ে সে সময় থেকে বাসিন্দারা তাদের জমির বিল তুলে নিজেদের ঘর বাড়ি ভেঙ্গে পূর্বাচলের পাশের মৌজাগুলোতে জমি ক্রয় করে নিজেদের ঘর বাড়ি নির্মান করে বসবাস করে আসছেন। এতোদিনে গুটিকয়েকজন ঘোষিত প্লট পেয়েছেন। অনেকেই প্রক্রিয়াধীন পর্যায় রয়েছেন পাবার আশায়।হয়তো পাবেন। কিন্তু পূর্বাচলের পাশের মৌজায় বাড়ি করা লোকজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন করে আবাসন নামের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। এসব স্থানে ঘর বাড়ি নির্মাণ করার পর আবার আবাসনের ধাক্কা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছেন। স্থানীয়দের ক্ষোভের শেষ না থাকলেও প্রশাসনের যেন কিছুই করার নেই। স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস মিয়া বলেন, একটি পাকা ঘর নির্মাণ করতে যা খরচ হয় তার একটি অংশ ব্যয় হয় মাটি ভরাট ও শ্রমিকদের পেঁছনে। আবার নির্মাণ কাজে যেসব ব্যয় করা হয় এতে সর্বস্ব ব্যয় হয়ে যায়। এভাবে একেকজন জমি মালিক বারবার ঘর নির্মাণ করতে থাকলে তার ভাগ্যে শান্তিতে বসবাস ঘটেনা। পূর্বাচল শহর আর আবাসনের নামে এসব ধাক্কা সইতে না পেরে অনেকেই অকালে প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবী করেন তিনি। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পূর্বাচলের পাশের মৌজা পিতলগঞ্জ, মোগলান, হিড়নাল, লক্ষ্যা শিমুলিয়া, দেবগ্রাম, কাঞ্চন, কেন্দুয়া, বিরাব, জাঙ্গিরসহ হাজারো ঘর বাড়ি, বিদ্যালয়, মসজিদ ,মাদরাসা,এতিমখানা, কবরস্থানসহ লাখো লোকের বসবাস। কিন্তু এসব এলাকায় বিলের ফসলি জমিতে পূর্বাচলের প্রভাবে আবাসন করার নামে নামে মাত্র মূল্যে কিছু ক্রয় করে বেশ কিছুই জোর করে ভরাট করে দখলে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের একটি ৩ কাঠা পরিমাণ প্লটের মূল্য যেখানে ১ কোটি ৫০ লাখের অধিক সেখানে একই পরিমান জমির মূল্য পাশের মৌজায় মাত্র ৮ থেকে ১২ লাখ। মূল্যের এতো ব্যবধান কেনো এমন প্রশ্নে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল সোবহান বলেন, পূর্বাচল দেশের একমাত্র পরিকল্পিত শহর। যেখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধা থাকবে। তাই সেখানে মূল্য একটু বেশি। যা দিগুন হারে বেড়ে চলেছে। আর পাশের মৌজায় একই পরিমাণ জমির মূল্য কম হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু এতো ব্যবধান মোটেও কাম্য নয়। এতে জমি মালিকা ঠঁকে যাচ্ছেন। কারন, তারা সিন্ডিকেট কবলে পড়ে নিজেদের জমি বিক্রি ইচ্ছে থাকলেও পছন্দমতো ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারছেন না। বাধ্য হচ্ছেন আবাসনের কথিত নকশায় আবদ্ধ হওয়ায় তাদের কাছেই বিক্রি করতে। স্থানীয় জমি মালিক আয়েব আলী বলেন, পিতলগঞ্জ মৌজায় জোর করে বালি ফেলার কারনে আমার ৩০ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি না। কারা ফেলছে সব জানি , সবাই জানে নামটা মুখে আনতে পারছি না। বালি ফেলার কারনে ব্যক্তি মালিকানা কোন লোক জমি ক্রয় করতে সাহস পাচ্ছে না। একই চিত্র দেখা গেছে কেন্দুয়া এলাকায়।ঢাকা এশিয়ান বাইপাস সড়কের পাশেরজমি মাত্র দেড় লাখ টাকা শতাংশ দর ঘোষণা দিয়ে জোর করে বালি ফেলে ভরাট করেছে একটি প্রভাবশালী মহল। মহা সড়কের পাশের জমি ২ বছর আগে যেখানে ২লাখ টাকা শতাংশ বিক্রি করা হতো সেখানে মাত্র ৫ লাখ টাকা শতাংশ দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ওই সিন্ডিকেটকে যেমন তাদের বেঁধে দেয়া মূল্যে জমি বিক্রি করতে হয় আবার জমি বিক্রি করার পর মূল্য পরিশোধ নিয়েও রয়েছে গড়িমসির অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন একটাই । কি করবে তারা? কোথায় নিরাপদ থাকবে না। কারন, হিসেবে জানা যায়, এসব অত্যাচারের শিকার হলেও স্থানীয় ভূমি অফিসের অসহযোগীতা এমনটি থানা পুলিশের সহায়তা পাচ্ছেন না তারা। তাদের অভিযোগ স্থানীয় বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধিরাই এসব সিন্ডিকেটে জড়িত। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। মুখ খুললেই হামলা, মামলা ও হয়রানীর শিকার হচ্ছেন । এসব বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, মানুষ সচেতন হলে প্রতারণার শিকার হতো না। যে কোন অন্যায় ও জুলুমের শিকার হলে আইনি সহায়তা পেতে হলে তাকে অভিযোগ করার সাহস রাখতে হবে। এ ধরনের কেউ থাকলে সরাসরি অভিযোগ করতে পারেন। আমরা আইনি সহায়তা দেবো। এ প্রসঙ্গে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের পরিচালক উজ্জল মল্লিক বলেন, পূর্বাচল বাস্তবায়নের শুরুতেই একটি জালিয়াত পক্ষ সক্রিয় ছিলো। তাদের কারনে অনেকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগে বেশ কিছু মামলা চলমান আছে ।