মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আরো ৫ লাখ নতুন রোহিঙ্গা !

0
88

মোরশেদুল আলম চৌধুরী-স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এখনও থামেনি। সদ্য অনুপ্রবেশকারীদের দাবি, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনারা এখনও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। যারা এখনও সেখানে আছে তাদের ‘ক্রীতদাস’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষায় আছে রাখাইনের বাকি রোহিঙ্গা সদস্যরা।

কক্সবাজারের একাধিক ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা
রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, ‘নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে আরও প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষায় আছে। প্রায় প্রতি রাতে কেউ না কেউ ওপার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাদের অধিকাংশই নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছেন। তিনশ’ রোহিঙ্গা ওপারের সীমান্তের বন-জঙ্গলে প্রবেশ করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষা করছে বলে খবর পেয়েছেন তারা।’

কক্সবাজার টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবদুল মতলব জানান, ‘রাখাইনের যেসব রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে আসতে পারেনি, তাদের আসলে আটকে রাখা হয়েছে। সেনারা তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে; স্থানীয় হাটবাজারেও তাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

এর ফলে খাবারের সঙ্কটে রয়েছে রোহিঙ্গা সদস্যরা। মানবেতর জীবনযাপনে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। এ কারণে সুযোগ পেলেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ সদ্য অনুপ্রবেশকারীদের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে সেনারা বড় আকারে জুলুম না করলেও ভেতরে ভেতরে কৌশলগত জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনের রাজধানী শিত্তুই বা আকিয়াব, রাথিডং, মংডুসহ পুরো রাজ্যের ১৭টি ‘টাউনশিপে’ পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে। সেখানকার রোহিঙ্গা সদস্যরা যে-হারে খণ্ডখণ্ডভাবে অনুপ্রবেশ করছে, তাতে একদিন সবাই এপারে চলে আসবে।’

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৭৬৪ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৫ দিনে নাফনদী পেরিয়ে ৫৩১ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে আগস্টে এসেছেন ২৫৬ জন এবং জুলাইয়ে ৪১৩ জন। এরআগে ২০ মে থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন আসা তিন হাজার রোহিঙ্গার সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অনুপ্রবেশকারীরা বেশির ভাগই টেকনাফের সাবরাং ও এর আশপাশের এলাকা থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জিরো টলারেন্সে রয়েেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা এখনও নৌকা নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ আগস্ট একটি নৌকায় করে ১২ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এসময় বিজিবি টহল দলের সদস্যরা তাদের বাধা দেয়। এছাড়া সেপ্টেম্বর মাসের গত শুক্রবার নাফনদী পেরিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় সাত রোহিঙ্গাবাহী একটি নৌকা ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে। একই দিন আরও দুটি নৌকায় করে প্রায় ১২ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে’ বলে দাবি করেছে সীমান্তের বসবাসকারীরা।

বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) টেকনাফ-২ ব্যাটেলিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার এ প্রসঙ্গে বলেন,‘রোহিঙ্গারা এখনও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’

গত সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন খাদিজাতুল কোবরা (২৬)। তার বাড়ি মিয়ানমারের বুশিডং (বুথিডং) এলাকার বড়িয়ং গ্রামে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। খাদিজা বলেন, ‘‘মিয়ানমার সেনারা নারীদের মারধর করে, স্বামীদের ধরে নিয়ে তাদের ‘ক্রীতদাস’র মতো ব্যবহার করছে। রাতে সেনাদের প্রহরী এবং দিনে গৃহকর্মীর কাজ করাচ্ছে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবার নিয়ে এপারে পালিয়ে এসেছি।’’

মেয়ের কানের দুল বিক্রির পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে আসেন আবুল খাইর। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সেনারা যাতে না দেখে, সে জন্য ঘর থেকে চুরি করে বের হয়ে সীমান্তে পৌঁছি। সেখানে দেখা মিলে আমাদের মতো অভাগা আরও দুই পরিবারের। তিন পরিবারের মোট ১২ জন উনচিপ্রাংয়ের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।’

তিনি জানান, তার গ্রামে আটশ’র উপরে ঘর ছিল। তারা চলে আসার পর বর্তমানে সেখানে পাঁচ ঘর রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সেখানে যেসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা রয়েছেন তাদের ওপর সেনারা সুকৌশলে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি হুমকি-ধমকি দিয়ে রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদের দিয়ে তাদের বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া সেনারা রোহিঙ্গা সদস্যদের ঠিকমতো ঘর থেকে বের হতে দেয় না, এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছে। ফলে সেখানকার রোহিঙ্গা পরিবারগুলো সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে চলে আসছে।’